Tuesday, January 12, 2010

পুঁইশাক : প্রচেত গুপ্ত

আবার একই কাণ্ড! একই ভুল!
এই নিয়ে দশ দিনের মধ্যে দু’বার ঘটল। ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে মনে হল, ভেতরে এমন কিছু আছে যেটা থাকার কথা নয়। শুধু তাই নয়, এ বারের ভুলটা যেন বেশি। প্রথম বার মনে হয়েছিল, জিনিসটা ঠাণ্ডা। আজ মনে হল, জিনিসটা ঠাণ্ডার সঙ্গে শক্তও। সাধারণ শক্ত নয়, লোহা পিতল যেমন শক্ত হয়, সে রকম শক্ত। বাজারের ব্যাগে লোহা কোথা থেকে আসবে?







প্রথম বারের মতো ঝটকা দিয়ে আজও হাত সরিয়ে নিলেন প্রলয় সমাদ্দার। তার ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি সামনের মাঘে ছাপান্ন শেষ করছেন। এই বয়সে একই ভুল বার বার হতে থাকলে দুশ্চিন্তায় ভুরু কুঁচকে যাওয়াটাই উচিত। আজ বাজারের ব্যাগে ভুল হচ্ছে, কাল ভুল হবে অফিসের কাজে। প্রাইভেট কোম্পানিতে ছোট পদের চাকরি। সামান্য ভুল হলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। তার ওপর অফিসের অবস্থা ভাল নয়, নড়বড় করছে। গত এক বছর ধরে অর্ডার কমেছে। ম্যানেজমেন্টও খরচ কমাচ্ছে। এ বছর বোনাস দিয়েছে আদ্দেক। কিছু দিন আগে পর্যন্ত অসুখ-বিসুখ, মেয়ের বিয়ে, ফ্ল্যাটের জন্য লোন চাইলে পাওয়া যেত। এখন হাজারটা ফ্যাকড়া তুলে আটকাচ্ছে। প্রোডাকশনের নিশিকান্ত মাইতির বউয়ের ইউটেরাসে টিউমার। অপারেশন লাগবে। গত মাসে দশ হাজার টাকার লোন অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়েছিল। এখনও এক পয়সা পায়নি। অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার তিন ধরনের ব্লাড রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে। ভাবটা এমন যে, অপারেশন হাসপাতালে হবে না, অপারেশন হবে অফিসের অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে। ম্যানেজার নিজে করবে। চাকরিতেও হাত পড়ছে। ইতিমধ্যে তিন জন পিওনকে ‘আর লাগবে না’ বলে বাদ দেওয়া হেয়ছে। প্রোডাকশনে দু’জনের কনট্র্যাক্ট রিনিউ হয়নি। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে, এ বার ক্লার্ক, অফিসারদের পালা। পরিস্থিতি কঠিন। সবাই কাঁটা হেয় আছে। এই অবস্থায় সামান্য ভুলও মারাত্মক।

ভুরু কোঁচকানো অবস্থাতেই প্রলয়বাবু ব্যাগের দিকে তাকালেন। না, কোনও গোলমাল নেই। রোজকার মতো রান্নাঘরের দোরগোড়ায় আধখানা মুখ খুলে কেতরে পড়ে আছে নির্দোষ ভঙ্গিতে। একটু যেন লাজুক ভাব! সম্ভবত বহু দিন ভরা বাজার নিয়ে পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি বলে লজ্জা। এই ব্যাগের প্রতি অবশ্য কোনও মমতা নেই প্রলয়বাবুর। সিন্থেটিকের এই জিনিস তাঁর একেবারেই পছন্দ নয়। তাঁর বিশ্বাস, বাজার করবার ব্যাগ হবে চটের। কিছু দিন আগে পর্যন্ত তিনি সে-রকম ব্যাগ নিয়ে বাজার যেতেন। বহু দিনের অভ্যেস ছিল। করবীদেবি হুট করে এক দিন অভ্যেস বদলে দিলেন। বদলালেন বড় অদ্ভুত কারণে।

‘এ আবার কী! আজকাল কেউ চটের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বাজারে যায় নাকি? বিশ্রী লাগে।’
প্রলয়বাবু অবাক হয়ে বলেন, ‘কেন যাবে না! অনেকেই যায়।’
করবীদেবি চাপা ধমক দিয়ে বললেন, ‘যে যায় যাক, তুমি যাবে না। বস্তার মতো দেখায়। কাল থেকে তুমি অন্য ব্যাগ নেবে। বিকেলে কিনে আনব। আজকাল অল্প দামে সিন্থেটিকের জিনিস পাওয়া যায়, সুন্দর দেখতে।’
প্রলয় সমাদ্দারের মনে হলো, স্ত্রীকেও পালটা একটা ধমক দেওয়া উচিত। বলা দরকার— ‘না, আমি এই ব্যাগ নিয়েই যাব। এতোবছর ধরে যা করছি হঠাৎ পালটাবো কেন? তা ছাড়া আমি কিসে বাজার করবো চটের বস্তা না লোহার ট্রাঙ্কে, সে ব্যাপারে তুমি নাক গলানোর কে? আমি কি তোমার ব্যাপারে নাক গলাই?’
প্রলয়বাবু ধমক দিতে পারলেন না। আজ থেকে দশ-পনেরো বছর আগে হলে হয়তো পারতেন, কিন্তু এখন পারেন না। ঘরে-বাইরে কোথাওই পারেন না। এটা তার পক্ষে যেমন অসুবিধের হেয়ছে, তেমন আবার সুবিধেরও হয়েছে। অসুবিধে হল, এর ফলে প্রায় কোনও সময়েই উচিত কথা বলা হয় না। আর সুবিধে হল, জীবনযাপনটা ক্রমশ ঝগড়া-ঝামেলাহীন, শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রলয়বাবু হিসেব করে দেখেছেন, একটা বয়েসের পর জীবনে উচিত কথার কোনও দাম নেই, দাম আছে শান্তির। শান্তির জন্যে তিনি নিজেই নিজের মেকানিজম্‌ তৈরি করে নিয়েছেন। ঘরে-বাইরে খানিকটা ধমকানি, দু’পাঁচটা অপমান, কিছুটা অবজ্ঞা চুপচাপ সহ্য করে নিলেই কাজ হচ্ছে। প্রথম প্রথম সমস্যা হত। এখন আর হয় না। প্র্যাক্টিস হয়ে গেছে। প্র্যাক্টিসে সব হয়। আজকাল ট্রামে বাসে কেউ পা মাড়িয়ে দিলে আর গায়ে লাগে না। অসহ্য গরম রাতে টানা লোডশেডিং চললেও ঘামে ভিজে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকেন। বাজারে ছোটখাটো ওজন ঠকানোর ঘটনায় চোখ ফিরিয়ে নেন। অল্প ক’টা পয়সার জন্যে ঝামেলা ভালো লাগে না। সে-দিন করবীদেবিকে ধমকাতে গিয়েও থমকে গেলেন। নরম গলায় বললেন, ‘কী হয়েছে বলো তো? তুমি হঠাৎ বাজারের ব্যাগের মতো সামান্য জিনিস নিয়ে পড়লে কেন?’

করবীদেবি ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, ‘আমি পড়ি নি, তোমার মেয়ে পড়ছে।’
‘মেয়ে! সুমি?’
‘সুমি ছাড়া তোমার আর ক’টা মেয়ে আছে? বোকার মতো কথা বলছো কেন? এতো বয়স হল, বোকার মতো কথা বলার অভ্যেস ছাড়তে পারলে না? সে-দিন সুমির শ্বশুরমশাই গাড়ি থেকে তোমায় দেখেছেন।’
একমাত্র মেয়ের শ্বশুরমশাই মানুষটি অতিরিক্ত রকমের বড়লোক। তার প্রসঙ্গ উঠলেই প্রলয় সমাদ্দারের নার্ভাস লাগে। সে-দিনও লাগল। কাঁপা গলায় বললেন, ‘সুমির শ্বশুরমশাই! আমাকে দেখেছেন?’

করবীদেবি গলায় ঝাঁঝ বাড়িয়ে বললেন, ‘তোমাকে দেখবেন কেন? তুমি এমন কিছু রাজা-গজা নও যে, তোমায় দেখতে হবে। তোমার ব্যাগ দেখেছেন। দিল্লি না মুম্বাইয়ের প্লেন ধরবেন বলে ভদ্রলোক ওই রাস্তা দিয়ে এয়ারপোর্ট যাচ্ছিলেন। গাড়ি থেকে দেখলেন, হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে তুমি চলেছো। ফিরে এসে সুমির কাছে হাসাহাসি করেছেন।’
‘হাসাহাসি! হাসাহাসি কেন? বাজারে ব্যাগ নিয়ে যাবো না তো কী নিয়ে যাবো, করবী?’ প্রলয়বাবুর বিস্ময় বাড়ে।
করবীদেবি কঠিন চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘উনি ব্যাগ বুঝতে পারেননি, বলেছেন, সুমি, তোমার বাবাকে দেখলাম সাতসকালে হাতে একটা ছোট বস্তা নিয়ে চলেছেন। ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছিল বলে দাঁড়াতে পারেনি, নইলে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করতাম। ব্যাপার কী বলো তো? ছি ছি। সুমির তো লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার অবস্থা। আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করল। বলল, মা, বাবা কি আজকাল সকালে বস্তা নিয়ে কাগজ কুড়োতে বেরোচ্ছে?’
প্রলয় সমাদ্দার ‘হা হা’ আওয়াজে বোকা ধরনের হাসলেন। বললেন, ‘কথাটা সুমি ভুল বলেনি। জিনিসপত্রের দাম যে ভাবে বাড়ছে তাতে ক’দিন পরে বস্তা নিয়ে কাগজ কুড়োতে বেরোলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বেঁচে থাকতে হলে একটা সাইড বিজনেস লাগবে। সে-দিক থেকে র্যাগ পিকার হওয়া সবথেকে ভালো। মূলধন লাগবে না।’
করবীদেবি এ বার গলা তুলে ধমকে উঠলেন, ‘চুপ করো। আমার সঙ্গে পচা ধরনের রসিকতা করবে না। মেয়ের একটা প্রেস্টিজ আছে। আগে ছিলো না, বিয়ের পর হয়েছে। তোমার মতো দু’পয়সার কেরানির ঘরে তার বিয়ে হয় নি। তুমি সম্বন্ধ দেখলে অবশ্য তাই হতো। মেয়ে নিজের পছেন্দ বিয়ে করেছে বলে হয় নি। সুমির শ্বশুরবাড়ির টাকা পয়সা সম্পর্কে কি তোমার এখনও ধারণা হয়নি?’
স্ত্রীর ধমকে দ্রুত হাসি মুছে প্রলয়বাবু বিড়বিড় করে বললেন, ‘অবশ্যই হয়েছে। সুমির বিয়ের দু’বছর হয়ে গেল এখনও ধাক্কা সামলাতে পারি নি। মাথার ওপর বিরাট ধার। রাতে ভালো করে ঘুম হয় না।’
করবীদেবি মুখে ‘ফুঃ’ ধরনের তাচ্ছিল্যের আওয়াজ করে বললেন, ‘তোমার টাকা নেই তাই ঘুম হয় না। সেটা তো সুমির শ্বশুরবাড়ির অপরাধ নয়। তারা তো আর এসে তোমাকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে পারবে না। যা-ই হোক, কাল থেকে তোমার ওই বস্তা বাতিল। সুমি বলে দিয়েছে, আর এক দিনও যদি তার শ্বশুরবাড়ির কেউ তোমাকে ওই অবস্থায় দেখে, তা হলে সে সুইসাইড করবে।’
প্রলয়বাবু বিনীত ভঙ্গিতে বলেন, ‘ব্যাগের বদলে আমি যদি বাজার বদল করি, করবী?’
‘বাজার বদল! মানে?’
‘মানে, এমন কোনও বাজারে গেলাম যে-দিকটায় এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথ পড়ে না। ধরো স্টেশনে র দিকে...। সুমির শ্বশুরমশাই তো প্লেনে ছাড়া যাতায়াত করেন না।’

করবীদেবি স্বামীর দিকে আগুন চোখে তাকালেন। প্রলয়বাবু বুঝলেন আর কথা বাড়ালে এ বার বড় ধরনের অশান্তি আসবে। চোখ নামিয়ে তাড়াতাড়ি বললেন, ‘ঠিক আছে করবী, তুমি ব্যাগটা বদলেই দিয়ো।’
ব্যাগ বদলেছে। তার পরে এই ঘটনা! এক দিন নয়, পর পর দু’দিন ঘটল। হাত ঢুকিয়ে মনে হল, ভেতরে এমন কিছু রয়েছে, যা বাজারের ব্যাগে থাকার কথা নয়। বিচ্ছিরি ধরনের মনের ভুল। ভুল কেন হচ্ছে?
প্রথম ঘটনাটা ঘটে এক বুধবার। বাজার থেকে ফিরে রোজকার মতো আনাজপাতি বের করতে গিয়েছিলেন প্রলয়বাবু। করবীদেবি স্বামীর এই একটা একটা করে ঝিঙে পটল বের করা সহ্য করতে পারেন না। টানাটানির সংসারে বাজার করা আনাজপাতি এমন কিছু হিরে জহরত নয় যে, বের করে সাজাতে হবে। তা ছাড়া যত দিন যাচ্ছে, আইটেম, কোয়ান্টিটি দুটোই কমছে। তাই নিয়ে এতো বাড়াবাড়ির কী আছে? এই কারণেই স্বামী বাজার নিয়ে ফেরার সময় করবীদেবি রান্নাঘরে আসেন না। খানিক পরে আসেন। সেই বুধবারও আসেন নি। কুমেড়ার ফালি বের করার সময়ে মুহূর্তের জন্য ব্যাগের ভেতরে অজানা জিনিসের স্পর্শ পেয়েছিলেন প্রলয়বাবু। একা একাই চমকে উঠেছিলেন। সাবধানে ব্যাগের মুখ বড় করে উঁকি দিলেন ভেতরে। না, অচেনা কিছু নেই। কুমেড়ার ফালির পাশে পড়ে আছে ক’টা ঢেঁড়শ, ছোট একটা পেঁপে। সবই চেনা! বছরের পর বছর হাতে ধরে নেড়েচেড়ে দেখছেন। ভুল বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়েছিলেন প্রলয়বাবু। কেন এমন হলো?

স্নান করতে করতে ঘটনা মনে পড়লো। ভুল হওয়ার পিছনে কারণ আছে। বছরখানেক আগে অফিসের নীতিশবাবু একটা গল্প বলেছিলেন। তাঁর বেকার শ্যালকের গল্প। শান্তশিষ্ট, গোবেচারা টাইপ সেই ছেলে বসিরহাট না বনগাঁ কোথায় যেন থাকে। ছোকরা এক সকালে বাজার সেরে ফিরে ব্যাগ থেকে পেঁয়াজকলি টেনে বের করতে গিয়ে ঠাণ্ডা, তেলতলে কিছু একটা ধরে ফেলে। বের করতে দেখা গেল ইঞ্চি তিন-চার লম্বা একটা সাপের বাচ্চা! পেঁয়াজকলির ডাঁটিতে জড়িয়ে আছে। বড় কিছু নয়, হেলে সাপ। শ্যালক বেচারি রান্নাঘরেই জ্ঞান হারায়। মনে আছে, গল্প বলে নীতিশবাবু খুব খানিকটা হেসেও ছিলেন। ভিতু শ্যালকের কাণ্ড নিয়ে হাসি। নিশ্চয় সেই গল্প এখনও মাথায় রয়ে গিয়েছে, আর তার থেকেই ভুল। মাথা খুব আশ্চর্য জিনিস। কোন পুরনো ঘটনা কখন উঁকি মেরে ফিরে আসে, কেউ বলতে পারে না।
কিন্তু সে তো বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। আজ আবার একই ভুল কেন হবে?
প্রলয়বাবু মন শক্ত করে ব্যাগের মুখটা বড় করে খুলে ধরলেন। না, আজও অচেনা, অজানা কিছু নেই। সাপ-ব্যাঙ, লোহা পিতল কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে চিমসে চেহারার পটল, ছোট সাইজের বেগুনটা। উচ্ছে দুটোও কুণ্ডুলি পাকিয়ে আছে। এক বারে ডান দিকে গুটিশুটি মেরে, মাথা দুমেড়মুচেড় রয়েছে খানিকটা সজনে ডাঁটা। আগে এই ডাঁটা ছিল জলভাত। এখন দামি জিনিস। কেনার সময় ভালো করে দেখে নিতে হয় ঠিকমতো বেঁকছে কি না। প্রলয়বাবু আজও বেঁকাতে চেয়েছিলেন। আনাজঅলা অনুমতি দেয় নি। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছে, ‘নেবেন তো ওই ক’টা, তার আবার সোজা বেঁকার কী আছে?’
প্রলয়বাবু ভেবেছিলেন, বেলা বাড়ালে ব্যাগের ঘটনা মন থেকে মিলিয়ে যাবে। মেলালো না। আবছা ভাবে রয়ে গেল। অস্বস্তির মতো। অস্বস্তি মানেই অশান্তি। প্রলয়বাবু বিরক্ত হলেন। তিনি অশান্তি পছন্দ করেন না।
খাওয়ার সমেয় করবীদেবি পাতে লাউয়ের তরকারি দিতে দিতে বললেন, ‘সামনের রোববার সুমি আসছে। ক’টা দিন থাকবে। জামাই দিতে আসবে। আমি জামাইকে দুপুরে খেতে বলেছি। প্রথমে রাজি হচ্ছিলো না, আমি জোর করেছি।’

প্রলয়বাবু অন্যমনস্ক গলায় বললেন, ‘জোর করলে কেন?’
করবীদেবি পরিবেশন বন্ধ করে বললেন, ‘মানে! ছেলেটাকে কতোদিন খাওয়ানো হয়নি বলো তো ?’
প্রলয়বাবু মুখ নামিয়ে ভাতের গ্রাস মুখে তুললেন। না, লাউটা ঠকিয়েছে। সজনে ডাঁটাও খারাপ হবে।‘আমি তা বলিনি, ওর হয়তো কাজ ছিল।’
করবীদেবি বললেন, ‘কাজ ছিল তো কী হয়েছে? তা বলে নেমন্তন্ন করব না? সুমিই বা কী ভাববে? এখন কিছু বলবে না, পরে কথা শোনাবে।’
প্রলয়বাবু বিড়বিড় করে বললেন, ‘তা হলে ঠিকই করেছো।’
করবীদেবি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, ‘তোমার কাছে ঠিক ভুলের সার্টিফিকেট চাই নি। ওই দিন ঠিকমতো বাজার করবে। সুমি বলছে, ছেলে চিংড়ি মাছ ভালোবাসে। তুমি গলদা নেবে। বড়টা পারবে না, সে মুরদ তোমার নেই, মাঝারিটা আনবে।’
অফিসে যাওয়ার পথে প্রলয়বাবু ট্রামেই হিসেব কষতে লাগলেন। গলদা চিংড়ির দাম এখন কতো যাচ্ছে? কার কাছ থেকে ধার পাওয়া যায়? নীতিশবাবুকে এক বার বলে দেখা যেতে পারে। নইলে অন্য চেষ্টা করতে হবে। হাতে ক’দিন সময় আছে।
ধার চাওয়া হলো না, নীতিশবাবু অফিসে আসেন নি। এদিকে অফিসে জোর গুজগুজ, ফুসফুস চলছে। ইউনিয়নের সঙ্গে বসে ম্যানেজমেন্ট নাকি গোপন লিস্ট বানাচ্ছে। ছাঁটাইয়ের লিস্ট। সেই লিস্টে ইউনিয়ন নিজের লোকদের বাঁচাবে। প্রলয়বাবু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। লিস্টে তার নাম নেই তো? থাকলে কঠিন সমস্যা হবে। মাথার ওপর ধারের বোঝা। তার ওপর রয়েছে সুমি। বেচারি শ্বশুরবাড়িতে কী বলবে? বুড়ো বয়েসে বাবার চাকরি চলে গিয়েছে?
চিন্তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে এক বার দেখা করলে কেমন হয়? অনেকেই নাকি করেছে। এত দিন পলিটিক্সের ধারে কাছে যাননি। এখন মনে হচ্ছে, কাজটা বিরাট ভুল হয়েছে। সে-রকম বুঝলে হাতে-পায়ে ধরতে হবে। ফাইল সরিয়ে উঠে পড়লেন প্রলয়বাবু। ওদের কী বলতে হবে? ভাই, দয়া করে আমাকেও আপনাদের সঙ্গে রাখবেন? কথা বলার সময় কী হাত কচলাতে হবে? কোনও সমস্যা নেই। হাত কচলানো যাবে।
নেতারা কেউ দেখা করলো না। দরজা বন্ধ করে ইমারজেন্সি মিটিং চলছে। মুখ বাড়িয়ে জানিয়ে দিলো, দিন তিনেকের আগে সময় হবে না। মনে গভীর অশান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন প্রলয়বাবু।
এদিকে নীতিশবাবু পরপর তিনদিন অফিসে এলেন না। তার সম্পর্কে মারাত্মক খবর পাওয়া গেছে। সেই খবর সত্যি না মিথ্যে, বোঝা যাচ্ছে না, তবে অফিসে সবাই জেনেছে। নীতিশবাবুর বনগাঁর এক শ্যালক নাকি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। ছোকরার বাজারের ব্যাগে রিভলভার পাওয়া গেছে। পুঁইশাকের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। পুলিশ হাতেনাতে ধরেছে। তল্লাশির সময় তারা ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে প্রথমে ঠাণ্ডা, শক্ত জিনিসের ছোঁয়া পায়। এমনি শক্ত নয়, লোহা পিতলের মতো শক্ত। এর পরই অস্ত্রটা টেনে বের করে। তখনও নলের সঙ্গে নাকি ক’টা পুঁইশাকের ভেজা ভেজা পাতা ঝুলছিলো! নীতিশবাবু শ্যালককে বাঁচাতে থানা পুলিশ করছেন।
খবর শুনে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন প্রলয়বাবু। সেই গোবেচারা টাইপ, ভিতু ছেলেটা না? সাপের বাচ্চা দেখে যে অজ্ঞান হয়ে গেছিলো?
রোববার সকালে ধার করা টাকায় জামাইয়ের জন্যে হাত খুলে বাজার করলেন প্রলয় সমাদ্দার। মাঝারি সাইজের গলদার সঙ্গে বড় ট্যাংরাও নিয়েছেন। সঙ্গে গাদাখানেক তরিতরকারি। যেমন করবীদেবি বলে দিয়েছিলেন। শুধু তার বাইরে দুম করে বেশ খানিকটা পুঁইশাক কিনে ফেলেছেন। কোনও দরকার ছিল না, তবু কিনেছেন। ঠিক করেছেন বাড়িতে ফিরে আগে গোপনে এক বার ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে দেখবেন। দেখবেন হাতে রিভলভারের ঠাণ্ডা, শক্ত ছোঁয়া লাগে কি না।
দু’বার ভুল হয়েছে বলেই যে বারবার ভুল হবে, তার কী মানে আছে?

-----------------
সংগ্রহ: আনন্দবাজার রবিবাসরীয় : ১০ জানুয়ারি ২০১০

2 comments:

Papia said...

বাহ

Anonymous said...

Casino - Hotel
Escape to 전주 출장안마 a beautiful city, 김제 출장안마 full of fun, and relaxation. Experience Vegas-style 영천 출장안마 luxury at the Casino Hotel in Las 아산 출장안마 Vegas, Nevada. This 5-star hotel and casino 제주 출장안마